আদিশূর ও বল্লাল সেন,

প্রথম অধ্যায়


ইতিহাস পুরাতত্ত্বানুসন্ধানের প্রধান সাধন, ইতিহাস ভিন্ন অতীত কালের কোন সত্যই নিঃসন্দেহরূপে নিরূপিত হয় না। ইতিহাসের এতাদৃশ প্রয়োজন সত্ত্বেও ভারতবর্ষের এক খানিও প্রকৃত ইতিবৃত্ত বিদ্যমান নাই। প্রাচীন আর্যগণ সাহিত্য, গণিত, দর্শন, শিল্প প্রভৃতি শাস্ত্রানুশীলন করিয়া পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু দুরপনেয় অদৃষ্ট-দোষে ইঁহাদিগের বহুল পরিমাণে ঐতিহাসিক গ্রন্থ প্রণয়নে অভিরুচি হয় নাই। রামায়ণে ইক্ষাকু বংশীয় কতিপয় নৃপতির এবং মহাভারতে কুরু পাণ্ডবদিগের বিবরণ স্থবিস্তাররূপে বর্ণিত আছে, পৌরাণিক গ্রন্থে ভারতীয় নৃপতিগণের বংশপরম্পরার নামোল্লেখ এবং তাহাদিগের প্রাদুর্ভাব কালের আনুসঙ্গিক ঘটনাগুলি বিবৃত আছে, এবং রাজতরঙ্গিণী প্রভৃতি দুই এক খানি গ্রন্থে দেশ বিশেষের বিবরণ লিখিত আছে, কিন্তু সমগ্র ভারতবর্ষের সূত্রবদ্ধ ও ধারাবাহিক ইতিবৃত্ত কোন গ্রন্থেই লিপিবদ্ধ নাই, এবং বিপ্লবের পর বিপ্লবে ভারতের ইতিহাস-স্থানীয় অনেক বিষয় বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে। অতএব পূৰ্ব্বতন সময়ের কোন বিষয় অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলে বহুল আয়াস ও আহরণ-ক্লেশ সহ করিতে হয়। প্রকৃত ইতিহাস অভাবে কবি-কল্পিত কাব্য শাস্ত্র, লোক পরম্পরাগত কিম্বদন্তী, কুলজিগ্রন্থ, তাম্রশাসন ও প্রস্তব-খোদিত বর্ণনাদির আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন উপায়ান্তর নাই। যদিও এই সকল উপকরণোপরি সম্পূর্ণরূপে আস্থা স্থাপন করিতে পারা যায় না, এবং কাব্য শাস্ত্র ও জন-প্রবাদ প্রভৃতি দ্বারা ঘটনা বিশেষ কাল ক্রমে বিকৃত অথবা অতিরঞ্জিত হইয়া যায়, তথাপি নিরপেক্ষ অনুসন্ধিৎসুগণ গবেষণা-বলে শাখ পল্লব ছেদন করিয়া স্কন্ধ অনাবৃত করিতে পারেন । ফলতঃ হিন্দুদিগের গ্রন্থাদি অস্পষ্ট, অথবা অতিরঞ্জিত দোষে দূষিত হইলেও স্থল বিষয়গুলি অনেক স্থলে যথাযথ বর্ণিত থাকে । আজ কাল ভারতের সৌভাগ্য বলে অনেকেই এবম্বিধ পুরাতত্ত্বানুসানে মনোনিবেশ করিয়াছেন; ঈদৃশী গবেষণায় এবং ঈদৃশী চেষ্টায় ভারতের ঐতিহাসিক ক্ষেত্র ক্রমেই পরিষ্কৃত হইতেছে।
আদিশূর ও বল্লাল সেন যে যে সময়ে গৌড় দেশের সিংহাসনাধিরোহণ করেন তত্তৎকালের কোন ইতিহাস বিদ্যমান নাই। ঘটক-কারিকায় এবং কুলজি গ্রন্থে এতদুভয়ের প্রাদুর্ভাব সময়ের কতিপয় প্রধান ঘটনা বর্ণিত আছে। বঙ্গ দেশে চিরাগত কিম্বদন্তীতে কতিপয় ঘটনা রক্ষিত হইয়াছে, এবং বঙ্গবার্সিদিগের সমাজ বন্ধনেও ইহাদিগের কার্য্য কারিতার কতিপয় জাজ্জ্বল্যমান নিদর্শন বর্তমান রহিয়াছে । এই সমস্তগুলিকেও ইতিহাসস্থানীয় গণ্য করিতে হইবে। উপরোক্ত কুলজিগ্রন্থাদি হইতে কতিপয় প্রধান ঘটনার উল্লেখ করা, এবং আদিশূর ও বল্লাল কোন জাতীয় ছিলেন বিনির্ণয় করা এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।
অম্বষ্ঠ কুলোদ্ভূত নৃপতি আদিশূর বঙ্গে বৌদ্ধদিগকে পরাজয় করিয়া স্বীয় সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন । বঙ্গবিজয়ের কতিপয় বৎসরান্তে রাজ্যে অনাবৃষ্টি ও প্রাসাদোপরি গৃধপাত প্রভৃতি দৈবোৎপাত ভাবী অমঙ্গলের চিহ্ন প্রকটিত করিলে, মহারাজ আদিশূর দৈবকাৰ্য্যদ্বারা তন্নিবারণে কৃত-সঙ্কল্প হইলেন, এবং পুরস্থ ব্রাহ্মণগণকে আহবান করিয়া কহিলেন, “আপনার বেদবিধি অনুসারে যজ্ঞের দ্রব্যাদি আহরণ করিয়া রাজ্যের অমঙ্গল নিরাকরণের উদ্যোগ করুন। বৌদ্ধ-বিপ্লবে বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণের মধ্যে বৈদিক ক্রিয়া লোপ হইয়াছিল, সুতরাং কেহই রাজার ঈপ্সিত কার্য্যে ব্ৰতী হইতে পারিলেন না। আদিশূর অনন্যেপায় হইয়া বেদজ্ঞ ও সাগ্নিক পঞ্চ ব্রাহ্মণ আনয়নার্থ কাণ্বকুজাধীশ্বর বীরসিংহের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন।[1] কাণ্বকুজাগত পঞ্চ ব্রাহ্মণ বৰ্ম্ম, চৰ্ম্ম ও ধনুৰ্ব্বাণ প্রভৃতি সামরিক সজ্জায় সুসজ্জিত হইয়। অশ্বারোহণে রাজদ্বারে উপস্থিত হইলে দৌবারিকগণ আদিশূর সমীপে ঈদৃশ অসামান্য বীর-বেশধারী ব্রাহ্মণগণের আগমন বার্তা নিবেদন করিল। রাজ ব্রাহ্মণগণের যুদ্ধবেশ এবং পাদুকা-সংশ্লিষ্ট-পদে তাম্বুল চর্বণ প্রভৃতি ব্রাহ্মণবিরুদ্ধ আচরণ সম্বাদে হৃতশ্রদ্ধ হইয়া কাণ্বকুজাগত পঞ্চ ব্রাহ্মণের সমাদরে অগ্রসর হইলেন না। ব্রাহ্মণগণ নৃপতির ঈদৃশ অসৌজন্যে বিরক্ত হইয় প্রত্যাবর্তনে কৃতনিশ্চয় হইলেন । কিন্তু তপোবল ও আত্ম-মহিমা প্রকাশার্থ শুষ্ক মল্লকাষ্ঠোপরি আশীৰ্ব্বাদ স্থাপন মাত্রে বিগত-জীবন শুষ্ক স্কন্ধ হইতে তৎক্ষণাৎ অঙ্কুর নির্গত হইল।[2] এই অলৌকিক ঘটনা দৌবারিকগণ কর্তৃক রাজসমীপে নিবেদিত হইলে আদিশুর স্বীয় অবিমৃষ্যকারিত অবধারণ করতঃ স্বয়ং অগ্রসর হইয়া ব্রাহ্মণদিগকে স্তুতিবাদে সন্তোষিত করিলেন, এবং তাহাদিগকে রাজভবনে আনয়ন করিয়া ঈপ্সিত কাৰ্য্যান্তে বহুল পরিমাণে ধনরত্ন প্রদান পূর্বক বিদায় করিয়া দিলেন। কাণ্বকুজাগত পঞ্চব্রাহ্মণের সহিত ষে পঞ্চ ভূত্য আগমন করিয়াছিলেন, তাহারাও তাহাদিগের সহিত স্বদেশে গমন করিলেন।[3]
বঙ্গদেশ হইতে পঞ্চ ব্রাহ্মণ স্বদেশে প্রত্যাগত হইলে তাহারা বঙ্গাদিদেশে তীর্থ যাত্রা বিনা গমন করাতে এবং অযাজ্য যাজন হেতু সমাজে বর্জিত হইয়াছিলেন। জ্ঞাতিগণ তাহাদিগের পুনঃ সংস্কারের নিমিত্ত বারম্বার অনুরোধ করিতে লাগিলেন । তাহারা ঐ প্রকার সমাজে অপমানিত হইয়া পুনঃ সমাজে গৃহীত হইবার আশায় কিয়ংকাল অতিবাহিত করিয়াছিলেন। কিন্তু জ্ঞাতিগণ কর্তৃক অপমানিত হইয়া স্বদেশে বাস করা অপেক্ষা দেশ পরিত্যাগ শ্রেয়ঃ, এই বিবেচনায় শ্ৰীহৰ্ষ, ভট্ট নারায়ণ প্রভৃতি পঞ্চ ব্রাহ্মণ এবং তাহদিগের সহিত মকরন্দ ঘোষ প্রভৃতি পঞ্চ ভৃত্য কাণ্বকুজ পরিত্যাগ করিয়া গৌরদেশে গমন করিলেন । এই প্রকারে ব্রাহ্মণগণ পুনরাগত হইলে আদিশূর তাহাদিগের প্রত্যেককে যথোচিত সৎকার করিয়া রাঢ়দেশে এক একখানি গ্রাম প্রদান পূর্বক বাসস্থান নির্দেশ করিয়া দিলেন। ব্রাহ্মণের সপ্তশতী সমাজ হইতে দার পরিগ্রহ করিয়া আদিশূর দত্ত ভূসম্পত্তির অধীশ্বর হইয়া পরমসুখে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। কালক্রমে পঞ্চ ব্রাহ্মণের কাণ্বকুজস্থিত পূৰ্ব্ব দারোৎপন্ন সন্ততিগণ পিতৃ উদেশে সমাতৃক বঙ্গদেশে আগমন করিলেন। কিন্তু তাহদিগের সহিত সপত্ন্য ভ্রাতাদিগের নিরন্তর অসমাবেশ হইবে আশঙ্কায় আদিশূর তাহাদিগকে বরেন্দ্র ভূমিতে স্বতন্ত্র গ্রাম নির্দেশ করিয়া বঙ্গে স্থাপন করিলেন, এবং বৈমাত্র ভ্রাতাদিগের পরস্পর ঈর্ষা জনিত দ্বেষভাব হেতু দুই সম্পূর্ণ পৃথক সম্প্রদায়ে কাণ্বকুজাগত সমস্ত ব্রাহ্মণগণ বিভক্ত হইয় গেলেন।
আদিশূর বঙ্গে পরম পণ্ডিত পঞ্চ ব্রাহ্মণ স্থাপন করিয়া বঙ্গের ভাবী উন্নতি তরুর বীজ বপনরুপ অচলা কীর্তি রাখিয়া লোকান্তরিত হইলেন। তদীয় পুত্র যামিনীভানু ও তৎপুত্ৰ অনিরূদ্র ও ক্রমে প্রতাপরুদ্র ভূদত্ত প্রভৃতি কতিপয় নৃপতি বঙ্গরাজ্য শাসন করিয়া মানবলীলা সংবরণ করেন । তৎপর আদিশূর বংশীয় শেষ রাজা নিরপত্য হেতু স্বীয় দৌহিত্র বিজয়সেন নামান্তর ধীরসেন অথবা বীরসেনকে সিংহাসন প্রদান করেন |[4]
বিজয়সেনের পিতা পিতামহাদির নাম কুলজি গ্রন্থে উল্লেখ নাই। কতিপয় বৎসর গত হইল রাজসাহীতে যে প্রস্তর ফলকাঙ্কিত শ্লোক আবিষ্কৃত ও তাহার যে অর্থোদ্ধার হইয়াছে তদনুসারে বিজয়সেনের পিতা হেমন্তসেন ও তদীয় পিতা সামন্তসেন চন্দ্রবংশোৎপন্ন দাক্ষিণাত্যাধিপতি বীরসেনের বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। সামন্তসেন বৃদ্ধ বয়সে স্বীয় সিংহাসন পরিত্যাগ পূর্বক গঙ্গাতটে আসিয়া বাসস্থান নিৰ্ম্মাণ করেন। সামন্তসেনের পৌত্র বিজয়সেন গঙ্গার উভয় পার্শ্বস্থ দেশ পরাজয় ও কামরূপ আক্রমণ করিয়াছিলেন ।
বাখরগঞ্জের তাম্র শাসনে সামন্তসেন, বিজয়সেন,বল্লালসেন, লক্ষণসেন এবং মাধবসেন এই পাচ নাম প্রাপ্ত হওয়া যায় । অতএব যদি বল্লালসেনের পিতা বিজয়সেন এবং প্রস্তরাঙ্কিত শ্লোকোল্লিখিত বিজয়সেন একব্যক্তি অনুমান করা যায়, তবে সেন রাজাদিগের বংশাবলি নিম্নলিখিত পৰ্য্যায়ানুসারে গণনা করা যাইতে পারে ।
আদৌ বীরসেন
তদ্বংশে সামন্তসেন
তৎপুত্র হেমন্তসেন।
তৎপুত্র বিজয়সেন নামান্তর ধীরসেন
অথবা বীরসেন
তৎপুত্র বল্লালসেন
তৎপুত্র লক্ষণসেন
তৎপুত্র কেশবসেন
কুলজি গ্রন্থে এবং অন্যান্য ইতিহাসেও আদিশূর বংশীয় দিগের পরেই বিজয়সেনের নামোল্লেখ ও তাহার রাজ্যলাভের বিররণ আছে। বীরসেন ও সামন্তসেন প্রভৃতির কোন উল্লেখ নাই, ইহাতে বোধ হয় যে আদিশূরের কয়েক পুরুষ পরেই হেমন্তসেন দাক্ষিণাত্য হইতে গঙ্গার নিকটবর্তী স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করেন। তাহার পুত্রের পরাক্রান্ত হইয়। রাজ্য বিস্তার করিতে লাগিলেন এবং ক্রমে গৌড়ের নিকটবৰ্ত্তী স্থানে বদ্ধমূল হইতে লাগিলেন । এদিগে আদিশূরবংশীয় নৃপতিগণ বিক্রমপুরে ক্রমেই হীনপ্রভ হইয়াছিলেন, এবং এই বংশের শেষরাজা জয়ধর, হেমন্তসেন বংশীয়দিগের সহিত সৌহার্দ স্থাপন জন্য বিজয়সেনকে কন্যা প্রদান করেন, তিনি ক্রমে সমস্ত বঙ্গের অধীশ্বর হইয়াছিলেন। কিন্তু বল্লালের পিতা ধীরসেন, নামান্তর বিজয়সেন এবং বীরসেন বংশে বিজয়সেন যে একব্যক্তি ছিলেন, ইহার কোন প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না । কিন্তু ধীর বা বিজয়সেন যে বল্লালের পিতা, ইহা কুলজি গ্রন্থ এবং বাখরগঞ্জ তাম্রশাসন দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে।
ধীরসেন বঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া পার্শ্ববর্তী কতিপয় দেশ যুদ্ধ দ্বারা পরাজয় করিলেন। এই সময়ে দিল্লীর সিংহসনে বৈরাগী বংশীয় রাজাদিগের শেষ রাজা, মহা-প্রেম[5] সিংহাসন ত্যাগ করিয়া বনে গমন করিলে দিল্লীর সিংহাসন শূন্য হইল। আর্য্যাবর্তের অন্যান্য রাজগণ দিল্লীর সিংহাসন শূন্য হইয়াছে অবগত হইয়া তদেশ বিজয় মানসে যুদ্ধের আয়োজন করিতে লাগিলেন। কিন্তু ধীরসেন ত্বরিতযাত্রায় সেনা সমভিব্যাহারে দিল্লীতে উপস্থিত হইলেন। পাত্রমিত্রগণ তাহাকে কোন মতেই নিবারণ করিতে পারিল না। সুতরাং বিনা যুদ্ধেই দিল্লীর সিংহাসন অধিকৃত হইল। তিনি দিল্লীর সিংহাসন বিজয় করিয়াছেন, এই সংবাদে অন্যান্য নৃপতিগণও যুদ্ধোদ্যমে বিরত হইলেন। ধীরসেন দিল্লীর সিংহাসন অধিকার হেতু বিজয়সেন নামে প্রসিদ্ধ হইলেন।
বিজয়সেন তদীয় জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ শুকসেনকে বঙ্গদেশের শাসনকার্য্যে নিয়োজিত করিয়া স্বয়ং দিল্লীতে অধিষ্ঠিত রহিলেন। শুকসেন তিন বৎসর বঙ্গদেশ শাসন করিয়৷ লোকান্তরিত হওয়ায় তদীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা বল্লালের হস্তে বঙ্গরাজ্য অর্পিত হয় । ইহার কতিপয় বৎসর পরে বিজয়সেন মানবলীলা সম্বরণ করেন।
বল্লাল তদীয় পিতার মৃত্যু সংবাদ শ্রবণ করিয়া স্বীয়-তনয় লক্ষণসেনকে বঙ্গরাজ্য শাসনের ভার অর্পণান্তর স্বয়ং দিল্লীতে যাত্রা করিলেন। তথায় কতিপয় বৎসর অতিবাহিত করিয়। বঙ্গদেশে পুনরাগমন করিয়াছিলেন। কথিত আছে, বল্লাল দিল্লীতে অধিষ্ঠান সময়ে পদ্মিনী নাম্নী এক নীচজাতীয় পরম সুন্দরী যুবতীর প্রণয়পাশে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। লক্ষণসেন এজন্য তাহাকে বারম্বার তিরস্কার করিয়া পত্র লিখেন। পত্রে যে সমুদয় শ্লোক লিখিত হইয়াছিল এবং তদ্ভুত্তরে বল্লাল যে সমুদয় শ্লোক রচনা করেন, তাহ অদ্যপি বঙ্গদেশে প্রচারিত আছে।
বল্লাল কতিপয় বৎসর বঙ্গরাজ্য সুশাসন করিয়া চরম বয়সে রাজকাৰ্য্য হইতে একপ্রকার অবসর গ্রহণ পূর্বক ধৰ্ম্ম শাস্ত্র আলোচনায় প্রবৃত্ত হন এবং সংস্কৃত ভাষায় কতিপয় গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, তন্মধ্যে দানসাগর সমধিক প্রসিদ্ধ। এই গ্রন্থে স্মৃতিশাস্ত্রানুমোদিত নানা প্রকার দান ও দানপদ্ধতি লিপিবদ্ধ আছে।
আদিশূর পঞ্চ ব্রাহ্মণ আনয়ন করিয়া যদ্রূপ অনন্তকালস্থায়ী কীৰ্ত্তি সংস্থাপন করিয়াছিলেন, বল্লালও তাদৃশ কোন উপায় দ্বারা স্বীয় নাম চিরস্মরণীয় হইতে পারে, অনুক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিলেন, এবং পরিশেষে পণ্ডিতদিগের সহিত যুক্তি করিয়া গৌড়-সমাজে কৌলীন্য মর্যাদার অবতারণা করিলেন।
বল্লালের সময়ে বঙ্গদেশে শৈব মত সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রাধান্য লাভ করে । বল্লাল নিজেও সাতিশয় শিব-পরায়ণ ছিলেন। দানসাগর গ্রন্থে, বল্লাল আপনাকে ‘পরমমাহেশ্বরনিঃশঙ্কশঙ্করঃ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন[6] কেহে কেহ বলেন বল্লাল ব্রহ্মপুত্র নদের ঔরসে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। যাহা হউক, এই সমুদয় অলৌকিক ঘটনার কোন প্রমাণ আমরা প্রাপ্ত হই নাই। এবং ঐ সমুদয় বিষয় উল্লেখ করাও নিম্প্রয়োজন। বল্লাল সৰ্ব্বশুদ্ধ বঙ্গে পঞ্চদশ বৎসর এবং দিল্লীতে দ্বাদশ বৎসর রাজত্ব করেন। আইন আকবরি মতে বল্লালের রাজত্বকাল পঞ্চাশৎ বৎসর নির্ণিত আছে ।
বল্লাল স্বর্গারোহণ করিলে লক্ষণসেন স্বীয় অনুজ কেশব সেনকে বঙ্গদেশের শাসন-কার্য্যে নিযুক্ত করিয়া স্বয়ং দিল্লীতে পিতৃসিংহাসন গ্ৰহণানন্তর রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন । লক্ষণসেন দশ বৎসর দিল্লী স্বশাসন করিয়া লোকান্তরিত হন, তৎপর কেশবসেন চতুর্দশ বৎসর, তাহার পর মাধবসেন একাদশ বৎসর ক্রমান্বয়ে বঙ্গদেশের ও দিল্লীর সিংহাসনে অধিরোহণ করেন। মাধব দিল্লীতে সিংহাসনাধিরোহণ সময়ে তদীয় ভ্ৰাত সদাসেন বঙ্গরাজ্য শাসন করিয়াছিলেন, কিন্তু মাধবের মৃত্যু হইলেও তদীয় সস্তানগণ দিল্লীতেই রহিলেন, বঙ্গরাজ্য সদাসেনের করায়ত্ত রহিয়া গেল, মাধবসেনের মৃত্যুর পর হইতে সদাসেন তেত্রিশ বৎসর বঙ্গরাজ্য শাসন করিয়াছিলেন। সেন বংশীয় নৃপতিদিগের বিজয়সেন হইতে সদাসেন পৰ্যন্ত ক্রমান্বয়ে নৃপতিদিগের নাম কুলজি গ্রন্থ, তাম্রশাসন, প্রস্তরাঙ্কিত শ্লোক, এবং আইন আকবরিতে প্রায় একপ্রকার উল্লেখ আছে, কিন্তু সদাসেনের পরবর্তী নৃপতিদিগের নাম আইন আকবরিতে যে প্রকার আছে, কুলজি গ্রন্থে তদ্রুপ নাই। আইন আকবরিতে সদাসেনের পরেই নৌজিব নামের উল্লেখ আছে, এবং তৎপর হইতে মুসলমানদিগের রাজ্য আরম্ভ নির্ণীত হইয়াছে। অতএব আইন আকবরি মতে নেজিবই বঙ্গদেশের শেষ হিন্দু রাজা। কিন্তু বৈদ্য-কুলজি মতে তেজসেন বৈদ্যবংশীয় শেষ রাজা, এবং সদাসেন ও তেজসেন এতদুভয়ের মধ্যে জয়সেন, উগ্ৰসেন, বীরসেন এই তিন নৃপত্তির নামোল্লেখ আছে। মিনহাজউদ্দীন কৃত তবকত নাসিরী গ্রন্থে লিখিত আছে, ১২০৩ খৃষ্টাব্দে বঙ্গদেশ বখতীয়ার খিলিজি কর্তৃক অধিকৃত হয়, ঐ সময় লক্ষণিয়া নামে অশীতি বর্ষ বয়ঃক্রম এক নৃপতি বঙ্গদেশের অধিপতি ছিলেন।
এই প্রকার নানা মতের কোনটি যথার্থ স্থির করা সুকঠিন, যে পর্য্যন্ত কোন সুনিশ্চিত প্রমাণ প্রাপ্ত না হওয়া যাইবে, তদবধি যিনি যে প্রকার সিদ্ধান্ত করুন না কেন, সমস্তই অনুমানে পর্য্যবসিত হইবে । অতএব আমরা সদাসেনের পরবর্তী নৃপতিগণের বৃত্তান্ত লিখিতে আপাততঃ ক্ষান্ত থাকিলাম । তবে গৌড়দেশ যে সেনবংশীয় শেষ নৃপতির হস্ত হইতে ঘবনগণ কর্তৃক অধিকৃত হয়, তাহার আর অনুমাত্র সন্দেহ নাই।
আদিশূর এবং বল্লাল কোন সময়ে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন, তাহা এ পর্যান্ত নিঃসন্দেহরূপে স্থির হয় নাই। পুরাতত্ত্বানুসন্ধায়িগণ পুস্তকাদির প্রমাণ, বংশাবলী দৃষ্টে সময়ের বিচার, এবং অনুমানের প্রতিনির্ভর করিয়া নানা মত প্রচার করিয়াছেন। কিন্তু এই সকল সিদ্ধান্তের কোনটি গ্রাহ, স্থির করা সহজ নহে। এ সম্বন্ধে মূল প্রমাণ “ক্ষিতীশবংশাবলি চরিত” “সময় প্রকাশে ” বল্লাল-কৃত দানসাগর গ্রন্থ রচনার সময় নির্দেশ, ব্রাহ্মণদিগের কুলজি গ্রন্থে পঞ্চ ব্রাহ্মণের আগমনকাল নিরূপণ, আইন আকবরিতে বঙ্গদেশের নৃপতিগণের তালিকায় তাহাদিগের রাজত্বকালের বৎসর গণনা, এবং অন্যান্য কতিপয় প্রমাণ । উপরোক্ত গ্রন্থগুলির কোন খানি প্রামাণ্য, পণ্ডিতগণ মধ্যে মত ভেদ দৃষ্ট হয়। একজন যে গ্রন্থ প্রামাণ্য বলিয়া স্বীকার করেন, অন্যে তাহা অপ্রামাণ্য বলিয়া উপেক্ষা করেন, অতএব আমরা আদিশূর এবং বল্লালের সময় নিরূপণে হস্তক্ষেপণ করিলাম না। পরিশিষ্টে কাহার কি মত ব্যক্ত করিলাম, পাঠকগণ তদ্দৃষ্টে স্বীয় স্বীয় সিদ্ধান্ত স্থির করিয়া লইবেন।

পাদঠিকা-----

[1] আদিশূর কাণ্বকুজেরশ্বর বীরসিংহ সমীপে নিম্ন লিখিত কতিপয় শ্লোক লিখিয়া লিপি প্রেরণ করেন: –
সুকৃত সুকৃত সংঘাঃ সৰ্ব্বশাস্ত্রার্থ দক্ষা, / লপিতহতবিপক্ষা স্বস্তিবাক্যাঃ শ্রীতিজ্ঞাঃ। / সুজিতস্বগতবৃন্দে গৌড়রাজ্যে মদীয়ে, / দ্বিজকুলবরজাতাঃ সানুকম্পাঃ প্রায়ান্তু।। / নৃপতি সুকৃতিসারঃ স্বীয়বংশাবতারঃ, / প্রবলবলবিচারো বীরসিংহোহতিবীরঃ। / ময়িবর সখি তাস্তে ভূমিদেবান সশূদ্রান, / পুনরপি মম গৌড়ে প্রাপ যত্নঃ নিতান্তং।
[2] বিক্রমপুরান্তর্গত মেঘনা নদীর পূর্ব উপকূলে রামপাল নামক স্থানে প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ এক প্রকাণ্ড সরোবরের খাত বিদ্যমান আছে। এই সরোবরের নাম রামপাল দীঘি এবং এই নদী হইতে উক্ত স্থানের নাম রামপাল হইয়াছে। সরোবরের অনতিদূরে পরিখাবেষ্টিত কতিপয় পুরাতন অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়, তন্নিকটবৰ্ত্তী গ্রাম সকলের অধিবাসিগণ এই ভগ্ন অট্টালিকা বল্লালের রাজ-প্রাসাদ বলিয়া পরিচয় দেয়। পরিখার স্থানে স্থানে নষ্ট হইয়া গিয়াছে, কিন্তু বেষ্টিত ভূমি খণ্ডের বিস্তৃতি এবং বাহ্যাবয়ব দৃষ্টে স্পষ্ট প্রতীত হয় যে এই স্থান এক অতি প্রবল পরাক্রান্ত এবং ধনশালী রাজার রাজধানী ছিল। ভগ্ন প্রাসাদের পুরদ্বারে একটা প্রাচীন গজাড়ী বৃক্ষ বিদ্যমান আছে। সকলেই এই গজাড়ী বৃক্ষটিকে আদিশূরানীত পঞ্চ ব্রাহ্মণ প্রদত্ত আশীৰ্ব্বাদে জীবিত মল্পকাষ্ঠ বলিয়া নিদর্শন করে। এই একটা মাত্র বৃক্ষ ভিন্ন রামপালের চতুষ্পার্শ্বে আর কুত্ৰাপি গজাড়ী বৃক্ষ নাই। চতুষ্পার্শ্বের অজ্ঞ ব্যক্তিরা এই বৃক্ষকে দেবতাস্বরূপ সম্মান করে, এবং অপুত্রবতী রমণীরা সন্তান লাভার্থ বৃক্ষমূলে পূজা মানসা করে। এই স্থানে ইষ্টক নিৰ্ম্মিত একটী কুপ আছে, সাধারণের সংস্কার এই বল্লাল ইহাতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন। রামপালের চতুষ্পার্শ্বে প্রস্তর নিৰ্ম্মিত অনেকগুলি মূৰ্ত্তি মৃত্তিকার নিম্ন হইতে উত্তোলিত হইয়া ঢাকা নগরীতে রক্ষিত আছে। এবং ইহার চতুষ্পার্শ্বে ৪। ৫ মাইল লইয়া মূৰ্ত্তিকার নিয়ে স্থানে স্থানে পুরাতন ইষ্টক প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই স্থানের বিবরণ রামপালের বিবরণ নামক পুস্তকে দ্রষ্টব্য।
[3] কাহার মতে আদিশূর কর্তৃক পঞ্চ ব্রাহ্মণের আনয়নের কারণ স্বতন্ত্র প্রকার নির্ণীত আছে। ক্ষিতীশ বংশাবলী চরিত মত রাজপ্রাসাদোপরিগৃধ্রপাতরূপ অনিষ্ট শাস্তি মানসে শাকুন যজ্ঞ করণার্থ কাণ্বকুজ হইতে পঞ্চ ব্রাহ্মণ আনীত হইয়াছিলো। কেহ কহেন যে অদিশূর রাজমহিষী বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণকে স্বীয় ব্রত সম্পাদনে অসমর্থ দেখিয়া কাণ্বকুজ হইতে পঞ্চ ব্রাহ্মণ আনয়ন করেন। ফলতঃ দৈবোৎপাত শান্তিমানসেই হউক অথবা যে কোন কারণেই ইউক পঞ্চ ব্রাহ্মণ যে যজ্ঞার্থ এ দেশে আনীত হইয়াছিলেন, তদ্বিষয়ে কাহারও মতাস্তর নাই।
[4] আইন আকবরি মতে আদিশূর-বংশীয় নৃপতিদিগের পশ্চাৎ ১০ জন পালবংশীয় নৃপতি গৌড় দেশ শাসন করিয়াছিলেন, তৎপর ধীরসেন ও বল্লালসেন প্রভৃতি বঙ্গরাজ্যের অধীশ্বর হয়েন। অম্বষ্ঠসস্বাদিকা গ্রন্থেও আদিশূর বংশীয় ও বল্লাল বংশীয় নৃপতিদিগের মধ্যে বৈদ্য জাতীয় পাল নামধেয় ১০ জন নৃপতির উল্লেখ আছে। ফলতঃ পালবংশীয়ের বৈদ্যজাতীয় ছিলেন কিনা মীমাংসা হওয়া এক্ষণে সুকঠিন। পালবংশীয় কতিপয় নৃপতি সম্বন্ধে প্রস্তর ফলকে অঙ্কিত যে সকল শ্লোক পাওয়া গিয়াছে, তাহাতে তাহাদিগের জাতির কোন উল্লেখ নাই । উত্তর কালে আরও কোন চিহ্ণ আবিষ্কৃত হইলে ইহার মীমাংসা হইবেক। আমরা এজন্য আদিশূর-বংশীয় নৃপতির পরই সেনবংশীয়দিগের উল্লেখ করিলাম এবং পালবংশীয় নৃপতিদিগের নামোল্লেখ এস্থানে করিলাম না। এ পরিশিষ্টে উক্ত বংশের তালিকা দেওয়া গেল ।
[5] রাজাবলি ৩৪/৩৫ পৃষ্ঠা দেখ।
[6] দান সাগর গ্রন্থের শেষভাগে লিখিত আছে। ধৰ্ম্মস্যাভূদিয়ায় নাস্তিকপদোচ্ছেদায় জাতঃ কলৌশ্রীকাস্তেহপি সরস্বতীপরিবৃতঃ প্রত্যক্ষনারায়ণঃ । পাদান্তোজনিষন্নবিশ্ববসুধাসাম্রাজ্যলক্ষ্মীযুতঃ। ঐবল্লাল নরেশ্বরো বিজয়তে সংস্কৃত্তচিন্তামণিঃ ইত্যাদি।
ইতি পরমমাহেশ্বরমহারাজাধিরাজনিঃশঙ্কশঙ্করঃ শ্রীমদ্বল্লালসেন দেববিরচিতঃ শ্রীদানসাগরঃ সমাপ্তঃ।