কলকাতার ইতিহাস

কলিকাতার প্রাণ-প্রতিষ্ঠা

(১৬৯০ খ্ৰীষ্টাব্দ ২৪শে আগষ্ট)

কলিকাতা একালের ও সেকালের, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, ১৯১৫
শ্রাবণের বৃষ্টি, বাঙ্গালার শস্য-শ্যামল-বক্ষকে, বর্ষার মেঘের পবিত্র ধারায় সিক্ত করিয়া বিরাম লইয়াছে। ভদ্রের আরম্ভ। তথনও বর্ষার শেষ হয় নাই। ভাদ্রের জলভরা মেঘ, তখনও নীলাকাশের গাত্র-সংলগ্ন। সে মেঘে কখন বৃষ্টি হইতেছে, কখনও বা আকাশ সহসা ঘন ঘটাচ্ছন্ন, আবার কখনও বা মেঘ-ভাঙ্গা সূর্য্যের, স্বর্ণ-কিরণে ধরা-বক্ষ প্লাবিত ও উজ্জ্বলিত।
সলিল-সম্পদময়ী ভাগিরথী, কূলে কুলে ভরিয়া উঠিয়াছে। পূর্ণ যৌবনে রূপসী যেমন আরও গরীয়সী হয়, তাহার সৌন্দর্য্য-সম্ভার সকল দিকে পূর্ণতা লইয়া ফুটিয়া উঠে-ভাগিরথীর অবস্থা তখন ঠিক সেইরূপ। দুকূল-প্লবী প্রচণ্ড
তরঙ্গাঘাতে, নদীর উভয় কুলেই ধস নামিতেছে। সে প্রচণ্ড তরঙ্গাঘাত সহ্য করিতে ন পারিয়া, সলিল-প্ৰহত শিথিল তটভূমি, গঙ্গা অঙ্গে, অঙ্গ মিশাইতেছে।
আমরা যে দিনের কথা বলিতেছি, সেদিন আকাশ প্রথমটা ঘন-ঘটাচ্ছন্ন, হইয়াছিল। বৃষ্টি হইয়া মেঘের বক্ষ শূন্য হওয়ায়, মেঘ সরিয়া পড়িল। আকাশ সম্পূর্ণরূপে মেঘমুক্ত, পরিষ্কার, অস্তগামী রবির স্বর্ণ-কিরণ রঞ্জিত।
সন্ধ্যার এই প্রাক্কালে, ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর নিশানওয়লা, চার পাঁচ খানি বাণিজ্য জাহাজ, গঙ্গার প্রচণ্ড শক্তিশালী উৰ্ম্মিমালার সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে, পাইলভরে অতি ধীরে ধীরে, সূতালুটার দিকে অগ্রসর হইতেছিল।
সেই জাহাজ-গুলির সঙ্গে, কয়েক খানি দেশী ছিপ, বোট এবং ভাউলিয়া ছিল। সেগুলিও নদীবক্ষের নানাস্থান অধিকার করিয়া, ধীরে ধীরে অগ্রসর হুইতেছিল।
জাহাজগুলি যখন সাঁখরাইলের কাছে আসিয়া পৌছিল, তখন সূৰ্য্য অস্তাচল চুড়াবলম্বী হইয়াছেন। নিশাগমন-সূচিত বিরলান্ধকারে—সমস্ত মেদিনী সমাচ্ছন্ন হইতেছে। আর বৃক্ষাদিপূর্ণ, জঙ্গলময় জনশূন্য, নদীকূলে অন্ধকার যেন আরও জমাট হইয়া পড়িয়াছে।
আমরা মোগল-রাজত্বে মাধ্যযুগের কথা বলিতেছি। আজকাল কলিকাতা সহর বলিয়া পরিচিত, সেই স্থান অধিকার করিয়া সেই সময়ে সূতালুটী, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা বলিয়া তিনখানি গণ্ডগ্রাম ছিল। ভাগিরথীও সেই সময়ে অতি প্রচণ্ড বেগশালিনী ও বিস্তৃত-কায়া ছিলেন।
সূতালুটী, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম তিনখানি পাশাপাশি ছিল। ইহাদের চারিদিকেই ভীষণ জঙ্গল। গ্রাম গুলিকে দুইভাগে বিভক্ত করিয়া মধ্যে একটী খাত ছিল। কার সাধ্য-সন্ধ্যার পর এই সমস্ত গ্রামের পথে একাকী বাহির হইতে পারে। চারিদিকে নরঘাতী দমু্য-তস্কর।
সূতালুটীতে—গঙ্গার উপকূলে একটা ক্ষুদ্র হাট ছিল। শেঠ ও বসুকেরা (বসাকেরা) সেই সময়ে সূতালুটীর প্রধান অধিবাসী ছিলেন। সূতার ব্যবসায়ই তাঁহাদের প্রধান উপজীবিকা । সূতালুটীর হাটে, বৎসরের মধ্যে কয়েকটী নির্দিষ্ট সময়ে, সুতা, কাপড় প্রভৃতি বিক্রয় হইত।
এই সমস্ত পণ্য কিনিত-ইউরোপীয় বণিকগণ। সেকালে বঙ্গদেশের সুতার, সূক্ষ্ম-কাটুনি জগত প্রসিদ্ধ। ইউরোপ খণ্ডে, বাঙ্গালার ঢাকাই মসলিনের বড় আদর। চরকা, কাটনা প্রভৃতির সহায়তায়—সেকালে যেরূপ অতি সূক্ষ্ম সুত। এদেশে জন্মিত, আজকাল কলেও সেরূপ হয় না।
তখন বঙ্গদেশে, ইংরাজ, পটুর্গীজ, দিনেমার প্রভৃতি বণিকগণ বাণিজ্য আরম্ভ করিয়াছিলেন। সপ্তগ্রামের পতনে, হুগলীর প্রাধান্য বাডিয়া উঠে। এই সমস্ত ইউরোপীয় সওদাগরেরা, এদেশের উৎপন্ন অনেক দ্ৰব্য-ইউরোপে। চালান দিতেন। সুতালুটীর হাট হইতে সকলকেই সুতা ও কাপড় কিনিতে হইত।
সন্ধ্যার বিরল অন্ধকারে শরীর ঢাকিয়া, ধীর মন্থর গতিতে, জাহাজ কয়খানি সাঁখরাইল ছাড়ইয়া, বর্তমান খিদিরপুরের পার্শ্ব দিয়া, ধীরে ধীরে সূতালুটী গ্রামের কাছে পৌছিল। নাবিকগণ যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া, সেই প্রবল তরঙ্গের উপর ক্ষুদ্র “পিনেস" বা জালি-বোট নামাইয়া দিয়া, জাহাজ গুলি নঙ্গর করিল। তখন গঙ্গার বয়া ছিল না, নঙ্গর করিবার জন্য কোন বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। অপরন্তু সেই জঙ্গলময় স্থানে মোট গুঁড়িওয়ালা গাছেরও—অভাব ছিলনা। ক্ষুদ্র বাণিজ্য জাহাজগুলি—বৃক্ষের মূলেই রজ্জু দিয়া বাঁধা হইল।
সেই বজরার মধ্য হইতে, একজন ইংরাজ একখানি পিনেসের সাহায্যে নদীতারে উপস্থিত হইলেন। নদীতীর হইতে সূতালুটীর বাজারের দিকে ধীর গতিতে অগ্রসর হইলেন। সেখানে গিয়া যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাঁহার প্রাণ শিহরিয়া উঠিল। নদীতীরে বাণিজ্য কার্য্যের জন্য, কোম্পানীর কৰ্ম্মচারিগণের যে কয়েকখানি মাটীর চালা ছিল--তাহার চালের খড় উড়িয়া গয়াছে— দেয়াল ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে, কোন কোনটীর বাঁশ-বাখারি দরাঁ প্রভৃতির চিহ্নমাত্রও নাই—কেবল ভিত্তির মাটী, বর্ষার প্রবাহ-ধৌত হইয়া কুটীরের অস্তিত্ব ঘোষণা করিতেছে।
আর যাঁহারা তাঁহার সহিত কুলে নামিয়াছিলেন--তাঁহারাও তাঁহার পশ্চাৎবৰ্ত্তী হইলেন। আশ্রয় স্থানের অবস্থা দেখিয়া, সকলেই চমকিয়া উঠিলেন । তাঁহাদের হস্তস্থিত লণ্ঠনের আলোক---সেই অন্ধকারময় শ্মশানবং নির্জন স্থানের উপর পড়িয়া, অতি ভীষণ দৃশ্যের সূচনা করিল।
অগ্রগামী ইংরাজটীর বেশভূষা অন্য সকলের অপেক্ষা অনেকটা বহুমূল্য। তিনি সেই অন্ধকারময় স্থানে কিয়ৎক্ষণ দাড়াইয়।--তারকাখচিত, মেঘ-মণ্ডিত, অন্ধকারময় আকাশের দিকে চাহিয়া কি ভাবিলেন । তার পর তাঁহার সঙ্গীগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন-- ‘ভাই সকল ! আমরা এই সূতালুটতে যে আশ্রয় স্থান টুকু করিয়া গিয়াছিলাম, তাহার পরিণাম ত তোমরা সবাই দেখিতেছ। বর্ষার রাত্রে, এই জঙ্গলের মধ্যে--তাবুতে বাসকরা বড়ই কষ্টকর হুইবে । চল -- আমরা আজকে রাত্রের মত জাহাজে ফরিয়া যাই। কাল প্রাতে আবার মাল-মসলা জোগাড় করিয়া নূতন আশ্রয় স্থান করিতে হইবে।”
তাঁহার অধীনস্থ সকলেই--তাহার মত সমর্থন করিল। সেই দীর্ঘকায় পুরুষ, ধীর গতিতে আবার জালি-বোটে উঠিলেন।
এই দীর্ঘাকার ইংরাজ, আর কেহই নহেন—স্বয়ং জব চার্ণক-কলিকাতার প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা।
পরদিন প্রভাতে, পরিচিত বাঙ্গালীদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, জব চার্ণক ইংরাজদিগের বাসের জন্য কয়েকখানি মৃৎকুটৗর-নিৰ্ম্মাণ করাইলেন। মাত্র একখানি কোটাবাড়ী ভাড়া লইয়া মেরামত করান হইল । কোম্পানীর কুঠীর কৰ্ম্মচারীরা সেই কুটীগুলি যত শীঘ্ৰ পারিলেন, দখল করিলেন।
এইরূপে প্রায় আড়াই শত বৎসর পূৰ্ব্বে, বৰ্ত্তমান প্রাসাদ সৌন্দৰ্য্যময়ী কলিকাতার, প্রাণ-প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল।
বৰ্ত্তমান বৎসর হইতে ২২৩ বৎসর পূৰ্ব্বে, আজকাল সে স্থনকে লোকে "হাটখোলা” বলে, সেই অঞ্চলেই জব চার্ণক কলিকাতার প্রাণপ্রতিষ্ট করেন। কেহ কেহ অনুমান করেন, বেনিয়াটোলা ঘাটের সমীপবর্ত্তী রথীতলা ঘাটই জব চার্ণকের কলিকাতার প্রাণ-প্রতিষ্ঠার প্রথম স্থান। উক্ত গভীর জঙ্গলময়ী গ্রামত্রয়, কালচক্রের আবর্ত্তনে, কিরূপে বনজঙ্গল সমন্বিত বেলা ভূমি হইতে, এই সাৰ্দ্ধ দুই শতাব্দী কাল ধরিয়া বৰ্ত্তমান প্রাসাদ্বময়ী নগরীতে পরিবর্ত্তিত হইয়াছে, তাহা বিবৃত করাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। কলিকাতার জীবনের এই অভিনব পরিবর্ত্তনের দিনে, প্রাচীন কলিকাতার, ইংরেজাধিকৃত কলিকাতার, বঙ্গদেশ মধ্যে ভারতের শেষ রাজধানী কলিকাতার, ঘটনাময় জীবনের সমস্ত কাহিনীই আমরা এই পুস্তকে যথাযথ লিপিবদ্ধ করিব।
কাপ্তেন ব্রুক বলিয়া একজন ইংরাজ, সেই সময়ে ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর পোতাধ্যক্ষ ছিলেন। জব চাৰ্ণক যে শুভমুহুৰ্ত্তে সূতালুটীতে উপস্থিত হন, সেই সময়ে কাপ্তেন ব্রুকও তাঁহার সমভিব্যাহারে ছিলেন । সেই স্মরণীয় দিনের ঘটনা, পুরাতন কাগজ পত্র হইতে আমরা যাহা কিছু পাইয়াছি, তাহা অবিকল নিম্নে উদ্ধৃত করা হইল। কারণ ইহা ব্যতীত কলিকাতার প্রাণ-প্রতিষ্ঠার আর কোন লিপিত বিবরণই নাই।
 “১৬৯০ খ্রীষ্টাব্দ- ২৪ আগষ্ট- আজ আমরা সাঁকরাইলে আসিয়া পৌছিলাম। কাপ্টেন ব্রুককে আদেশ করা হইল, যেন তিনি তাহার অধীনস্থ বাণিজ্য পোতগুলি, হুতালুটী হাটের সন্নিকটে নঙ্গর করেন। তিনি অপরাহ্ণে এই স্থানে উপস্থিত হন। এ স্থানের অবস্থা অতি শোচনীয়।” আমাদের আশ্রয় লইবার উপযুক্ত, কোন স্থানই সেখানে ছিল না। যাহা কিছু ছিল সবই গিয়াছে। দিন রাত বৃষ্টি হইতেছিল । নদীগর্ভে বোটের উপর বাসও স্বাস্থ্যকর নহে। আমরা পূৰ্ব্ববারে এই সূতালুটীর মধ্যে যে দুই একখানি কুঁড়ে ঘর রাখিয়া গিয়াছিলাম, তাহার চিহ্নমাত্র নাই। আমরা এ স্থানত্যাগ করিবার পরই, মল্লিক বরকদার (বৃকোদর মল্লিক ?) ও দেশীয় লোকেরা চালাগুলি জালাইয়া দিয়াছে এবং বাঁশবেড়া ইত্যাদি যাহা ছিল, সবই লইয়া গিয়াছে। *
*1600 August 24. This day at Sankraal ordered Captain Brooke to come up with his vessel to Chutta-nutty, where we arrived about afternoon, but found the place in a deplorable condition, nothing being left for our present accomodation and the rain falling day and night. We are ________ be take to Boats, which considering the season of the year, is very unhealthey. Mullick Burcoodar and the country people at our leaving this place burning and carrying away what they could.

 

No comments:

Post a Comment